ঈদুল ফিতরের উদযাপনের জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজধানী ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়ায়, বাড়ি ফেরা যাত্রীদের জন্য ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটি আবারও অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষের চলমান প্রস্তুতি সত্ত্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ করিডোরটিতে তীব্র যানজট, দীর্ঘ বিলম্ব এবং যাত্রীদের দুর্ভোগের আশঙ্কা রয়ে গেছে।
দেশের এন২ জাতীয় মহাসড়কের অংশ ঢাকা-সিলেট রুটটি রাজধানীকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জগামী যাত্রীদের পরিষেবা দেয়। প্রতি বছর ঈদের সময় এই মহাসড়কে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়—কিন্তু চলমান নির্মাণকাজ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এ বছর পরিস্থিতি আরও বেশি কঠিন বলে মনে হচ্ছে।
হাইওয়ে পুলিশের ভাষ্যমতে, ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে প্রায় ২০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কে অন্তত ৪৩টি যানজটপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। কাঁচপুর, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ওসমানীনগরের মতো এলাকাগুলো প্রধান যানজটের কেন্দ্র, যেখানে প্রায়শই যান চলাচল ব্যাহত হয়।
সবচেয়ে সমস্যাবহুল অংশগুলোর মধ্যে একটি হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ–বিশ্বরোড সড়ক। এই ১২ কিলোমিটার অংশে ধীর গতিতে সম্প্রসারণের কাজ চলছে, যার ফলে প্রায়শই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে। রাস্তার ভাঙাচোরা অবস্থা, গর্ত এবং সরু গলি পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে, যার ফলে যানবাহনগুলোকে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হয় এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
কর্তৃপক্ষ প্রতিবন্ধকতাগুলো স্বীকার করেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ছয়-লেন সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাত্র ২০ শতাংশ কাজ এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। অস্থায়ী মেরামত করা হয়েছে এবং যান চলাচল ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও, এই অসমাপ্ত নির্মাণকাজ মসৃণ যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি করে চলেছে।
নির্মাণকাজের বিলম্ব ছাড়াও আরও বেশ কিছু কারণ ঈদের ভিড়ের সময় যানজট আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। রাস্তার ধারের অননুমোদিত হাট, অবৈধ পার্কিং এবং যেখানে-সেখানে বাস ও সিএনজি অটোরিকশার থামানো যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়, বিশেষ করে বিশ্বরোড ও আশুগঞ্জের মতো ব্যস্ত মোড়গুলোতে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই রুটে যাতায়াতের সময়—যা সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা—ঈদের ব্যস্ততম দিনগুলোতে দ্বিগুণ বা এমনকি তিনগুণও হতে পারে এবং চরম ক্ষেত্রে তা ১২-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত গড়াতে পারে।
এদিকে, ঢাকা থেকে বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে ইতোমধ্যেই চাপ বাড়ছে। ঢাকা-সিলেট রুটসহ বেশ কয়েকটি মহাসড়কের প্রধান প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ীর মতো এলাকাগুলোতে ঈদের ব্যস্ততা বাড়ার সাথে সাথে যানজট শুরু হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত হাইওয়ে পুলিশ মোতায়েন করেছে এবং নির্মাণাধীন এলাকাগুলোতে অন্তত দুটি লেন চালু রাখার ব্যবস্থা নিয়েছে। ভারী যানবাহনের ওপর বিধিনিষেধ এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধিও এই পরিকল্পনার অংশ। তবে, যাতায়াতের ব্যাপক চাহিদা এবং ক্রমাগত কাঠামোগত সমস্যার কারণে যাত্রীরা সন্দিহানই রয়েছেন।
অনেকের কাছে ঈদের দিনে বাড়ি ফেরাটা শুধু ভ্রমণ নয়—এটি পরিবার ও ঐতিহ্যের সান্নিধ্যে এক আবেগঘন প্রত্যাবর্তন। কিন্তু ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বারবার ফিরে আসা প্রতিবন্ধকতাগুলো সেই যাত্রাকে ধৈর্যের এক পরীক্ষায় পরিণত করে চলেছে।
দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন না হলে এবং যান চলাচলে শৃঙ্খলা প্রয়োগ করা না হলে, প্রতিটি উৎসবের মরসুমে মহাসড়কটি একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
